কাশ্মীরী চাদর এবং নামকরণের স্বার্থকতা।
কাশ্মীরী চাদর বা সোয়েটারের প্রতি আমাদের সবার অন্য ধরনের আকষর্ণ থাকে, শীতের দিনে বেশি উষ্ণতা পাওয়ার কারণে অনেকের পছন্দের শীর্ষ তালিকায় থাকে।একদিকে হালকা প্রকৃতির এবং অনেক উষ্ণতা সমৃদ্ধ আর সেই সাথে ত্বকের কোন প্রকার চুকানি বা আরামদায়ক নয় এমন কিছু না করার কারণেই এই চাদর আমাদের সবার পছন্দের তালিকায় থাকে।কিন্তু আজকাল বাজারে গেলেই নকল কাশ্মীরি চাদরকে আসল বলে চালিয়ে দেওয়া হয় বলে, এই চাদরের আসল গুণ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।
আজকে কিভাবে কাশ্মীরি চাদর চিনতে হয় বা এই নাম কিভাবে হল বা কোথা থেকেই তৈরী হয় এসব নিয়ে আলোচনা করবো।
কাশ্মীরী চাদর মানে ভারত-পাকিস্তানের "দখলকৃত" কাশ্মীরের তৈরি কোন চাদর না!
কাশ্মীরী চাদর বা অন্য পোশাক পৃথিবীর অন্য দেশেরও তৈরি হতে পারে এবং বাস্তবেও তাই হচ্ছে। কাশ্মীরী পোশাক ইংল্যান্ড, ইতালি বা চীনের তৈরিও হতে পারে। তাহলে আপনি নিশ্চয়ই এখন প্রশ্ন করছেন- তাহলে নাম কেন কাশ্মীরী হল? আসুন একটু জেনে নিই।
এই ছাগল গুলোর কতোগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো অন্য সকল পাহাড়ি ছাগল থেকে আলাদা।
যেমন - এদের গায়ের পশম খুবই চিকন এবং সিল্কি।
বন্য পরিবেশে মাইনাস 40'C তাপমাত্রায়ও এরা দিব্যি বেঁচে থাকে যেখানে অন্যান্য অনেক ছাগল (ভেড়া নয়) মাইনাস 10/15'C তে বন্য পরিবেশে মারা যায়। এবং সমুদ্র সমতল থেকে চার হাজার মিটার উচ্চতায়ও এদের বিচরণ করতে দেখা যায়।
১৩'শ শতকে বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পলো মঙ্গোলিয়ায় অনেক উচুতে পাহাড়ের গুহায় এসব ছাগলের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন।
এই ক্যাপরা হিরকাস ছাগল গুলো এখন অনেক দেশেই বাণিজ্যিক ভাবে খামারে পালন করা হয় অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই এগুলোকে গৃহপালিত (domesticated) করা হয়েছে।ফলে প্রাকৃতিক ভাবে ছাড়াও অনেক দেশে এসব ছাগল পাওয়া যায়। দুই ভাবে এসব ছাগল থেকে পশম সংগ্রহ করা হয়।
১) মেশিন দিয়ে গায়ের সকল লোম ছেঁটে ( shearing) মান অনুযায়ী বাছাই করা হয় , তারপর পশমকে ধুয়ে , গরম পানিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সিদ্ধ করে , রং মিশিয়ে এবং শুকিয়ে সুতা তৈরি করা হয়।
২) খামারে পালিত তবে উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত এসব ছাগলের লোম মানুষের চুল আঁচড়ানোর মতো ধীরে ধীরে আঁচড়ালে মূল পশমের নিচে আরেক ধরনের খুব সুক্ষ্ম কিছু লোম/পশম পাওয়া যায় এবং এগুলো সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে সুতা তৈরি করা হয়।
এভাবে একটি প্রাপ্ত বয়ষ্ক ছাগল থেকে সারা বছরে সর্বোচ্চ দেড়'শ গ্রাম পশম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী কেশমির পশমের থিকনেস হতে হবে ৯০ মাইক্রনের কম।এই দুই প্রকার সুতাকে বলা হয় কেশমির (Cashmere)।
খেয়াল করুন , অন্যান্য ছাগল ভেড়া উট খচ্চর লামা গুয়ানাকো আলপেকা ইয়াক ইত্যাদি পশু গুলো থেকে সংগৃহীত পশমের সুতাকে উল (Wool) বলা হলে বলেও ক্যাপরা হিরকাস থেকে সংগৃহীত গুলোকে বলা হয় কেশমির! যদিও এগুলো উল।সুতরাং কেশমির পাওয়া যায় এমন জাতের ছাগলকে বলা হয় কেশমিরি ছাগল (Cashmere goat)।
কাশ্মীর অঞ্চলে এসব ছাগলকে "পশমিনা" ছাগলও ডাকা হয়। এই ছাগলের জাতের কাছাকাছি আরেকটি জাত হলো আঙ্গুরা ছাগল। এগুলোর লোম খসখসে হয়।কেশমির (Cashmere) যাকে অনেকে উচ্চারণ করে কাশমিরি বা কাশ্মীরী- এখান থেকেই মূলত ছড়িয়েছে "কাশ্মীরী শাল"। যার ফলে মেইড ইন ইংল্যান্ড কোন সোয়েটার দেখলেও অনেকে হেঁসে বলে - ইংল্যান্ডে তৈরি হলে আবার কাশ্মীরী হল কিভাবে! কারন অনেকেই মনে করেন যে কাশ্মীর নাম থেকেই কেশমির নামটি এসেছে।
যাহোক উপরে এক তারকা ১ নং চিহ্নিত সুতা থেকে তৈরি কাপড় - হলো সাধারণ মানের কেশমিরি শাল (কাপড়)। ২নং চিহ্নিত সুতা দিয়ে অতি অভিজাত বা বিশ্বখ্যাত ধনি ব্যাক্তিদের জন্য স্কার্ফ/মাফলার , কোট , পুল ওভার , সোয়েটার , সার্ট , হাত মোজা ইত্যাদি তৈরি হয়।
বর্তমানে পৃথিবীর উৎকৃষ্ট মানের অর্থাৎ কম্বিং কেশমিরের মোট উৎপাদনের ৭০ ভাগ চীন , ১৮ ভাগ মঙ্গোলিয়া এবং বাকী ১২ ভাগ সারা বিশ্বে উৎপাদিত হয়। একটি ইতালিয়ান কেশমিরি চাদরের দাম প্রায় ৮৭ হাজার টাকা (৩৭৫০ দিরহাম) এবং মহিলাদের একটি পুল ওভার কোটের দাম দশ লাখ টাকা প্রায় (৪৩ হাজার দিরহাম+৫% ট্যাক্স) পর্যন্ত হতে পারে।
আসুন এবার আসল কেশমিরি চাদর বা কাপড় চেনার কিছু কৌশল জেনে নেই-
১. স্টিকারে ইংরেজিতে লিখা থাকবে 100% CASHMERE.
২. শাল/ চাদর/ মাফলার গুলো সাধারণত এক বা সর্বোচ্চ দুই পাকের (Ply) সুতার তৈরি হবে।
৩. অন্যান্য উলের কাপড়ের চেয়ে খুবই নরম কোমল এবং সিল্কি।
৪. সুতার তন্তু গুলো খুবই চিকন (thick) যা ৩০ মাইক্রনের কম হয়।
৫. কাপড় থেকে পশম খুলে আসবেনা বা খসে পড়বেনা।
৬. অনেকটুকু কাপড় মুষ্টিবদ্ধ করে চাপ দিয়ে ছেড়ে দিন, কোন ভাঁজ পড়বেনা।
৭. হাতের তালুর উল্টা পিঠে কাপড়টি লাগিয়ে আস্তে করে আরেক হাতে টানতে থাকুন, খুব মিহি শীতল অনুভূত হবে, খসখসে নয়।
৮. দুই পরত কাপড় একসাথে ঘষা দিন, তুলনামূলক বেশি পিচ্ছিল হবে।
৯. তুলনামূলক ওজনে হালকা এবং পাতলা কাপড় হলেও অধিক গরম ( more heat resistant)।
১০. একেবারে খালি গায়ে পরিধান করলে কোন প্রকার চুলকানি বা অস্বস্তি হয়না।
১১. ঠোঁটের সাথে আস্তে করে ঘষা দিন, মকমলের মতো অনুভূত হবে।
১২. গরম পানিতে ভিজালে মৃদু গন্ধ ছড়াবে।
১৩. কখনোই খুব উজ্জ্বল চকচকে রংয়ের হবেনা।
সর্তকতা - শুধুমাত্র বেবী শ্যাম্পু দিয়ে ধুইবেন, সম্ভব না হলে সাধারণ শ্যাম্পু দিয়ে, হাতে ধুইবেন মেশিনে নয়, শুধু ঝুলিয়ে রেখে শুকাতে দিন।
Shourav Dey
Department of Apparel Engineering, 44th Batch
Bangladesh University of Textiles.


No comments